মানিক লাল ঘোষ


প্রতিভা গুণে বিখ্যাত স্বনামধন্য সাংবাদিক এর সংখ্যা বাংলাদেশে বেশি না হলেও একেবারে কমও নয়। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার আদায়, পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণ, তাদের রুটি-রুজির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে নিজ পেশার সবার ও হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ।

আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল আলতাফ মাহমুদ চেতনাগত বিপরীত মেরুতে অবস্থানগতকারীদের মাঝেও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন তার নেতৃত্বগুণে। প্রয়াত আলতাফ মাহমুদের জানাজায় ও শোক প্রকাশের বিবৃতিতে মিলেমিশে একাকার হয়েছিলেন নানা মত ও পথের অনুসারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিক সমাজ। সেই জনপ্রিয় সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদকে মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছরেই ভুলতে বসেছি আমরা।

২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমাদের প্রিয় আলতাফ ভাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গণমাধ্যম জগতের এই জনপ্রিয় নেতা। দীর্ঘদিন সার্ভিকাল কমপ্রেসিভ মাইলো রেডিকিউলোপ্যাথি নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার সামর্থ্য ছিল না তার। উন্নত চিকিৎসা নিতে সরকার প্রধান দিয়েছিলেন ১০ লাখ টাকার অনুদান। মৃত্যুকালে সততা, আদর্শ ও কর্মীদের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই রেখে যাননি আলতাফ মাহমুদ। তার মৃত্যুতে সাংবাদিক সমাজে নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেক গণমাধ্যমকর্মী ও নেতাদের সেদিন অঝোরে কান্না করতে দেখেছি। সেদিন বুঝে উঠতে পারিনি সেই কান্নার ভাষা।

ডিইউজে ও বিএফইউজের নির্বাচনী মাঠে নেমে বুঝতে ও জানতে শিখেছি নন্দিত সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদকে। অনুভব করতে পারছি কত বড় অভিভাবক ছিলেন তিনি সাংবাদিক সমাজের!!

একদিনে গড়ে উঠেননি একজন আলতাফ মাহমুদ। পটুয়াখালীর গলাচিপায় জন্মগ্রহণ করেন খ্যাতিমান সর্বজন প্রিয় এই সাংবাদিক নেতা। আলতাফ মাহমুদের ৩৫ বছরের সাংবাদিকতা পেশা শুরু গত শতকের সত্তরের দশকে দৈনিক স্বদেশে। দীর্ঘদিন সাপ্তাহিক খবরের প্রধান প্রতিবেদক এর দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেছেন দৈহিক কিশান, দৈনিক খবর, মাই টিভিসহ বিভিন্ন মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদে। মৃত্যুর আগে কর্মরত ছিলেন দৈনিক ডেসটিনির নির্বাহী সম্পাদক পদে। পেশাগত জীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বড় বড় সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহ করতেন তিনি। বিভিন্ন টেলিভিশনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে টকশোতে অংশ নিতেন তিনি।

অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন পাঁচবার। সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফউজের মহাসচিব এর দায়িত্ব পালন করেন আলতাফ মাহমুদ। সর্বশেষ বিএফউজের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মাত্র অল্প কয়েকদিন পর মাত্র ৬৫ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

অত্যন্ত বিনয়ী সাংবাদিক নেতা ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। মেধা, যোগ্যতা ও শ্রমের মধ্য দিয়ে সাংবাদিক জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। আমার দেখা একজন সত্যিকারের ভালো মনের মানুষ ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। কখনো কাউকে মনে কষ্ট দিয়ে কথা বলেছেন এমন কথা আজ পর্যন্ত শুনিনি কারো মুখে। বরং সিনিয়র নেতাদের মুখে শুনেছি ইউনিয়নের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার সাহসিকতার কথা।

আপাদমস্তক একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। একজন সাচ্চা নীতিবান নেতা ছিলেন তিনি। নির্লোভ আলতাফ মাহমুদ হালুয়া রুটির ভাগাভাগির নীতিতে বিশ্বাস করতেন না, সাংবাদিক সমাজের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব ভোলার নয়। শুধু নেতৃত্ব দেয়াই নয়, অসুস্থ ও অসহায় সাংবাদিকদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতেন। ছুটে যেতেন কারো অসুস্থতার সংবাদ পেলে। পেশাদারিত্বের মর্যাদা রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন আলতাফ মাহমুদ।

আলতাফ মাহমুদ এর মৃত্যু কতটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে গণমাধ্যম জগতে তা এখন অনুধাবন করতে পারছেন চাকরিচ্যুত ও অধিকার বঞ্চিত সাংবাদিক সমাজ। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংকটকালে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন আলতাফ মাহমুদ। তাঁর মৃত্যু সাংবাদিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। পেশাগত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি ছিলেন আপসহীন ও অগ্রগামী সাংবাদিক নেতা।

সাংবাদিক সমাজ আজ নানা সংকটে আচ্ছন্ন। চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই, গণমাধ্যমকর্মী আইনের বেড়াজালে মুক্ত গণমাধ্যমের কন্ঠরোধের যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এই সংকটকালে একজন আলতাফ মাহমুদ এর আজ বড্ড বেশি প্রয়োজন। আলতাফ মাহমুদদের মৃত্যু নেই, চেতনার বাতিঘর হয়ে আলো ছড়ান তারা। অতল শ্রদ্ধা গণমাধ্যমকর্মীদের পেশার স্বার্থ সংরক্ষণে আমৃত্যু লড়াকু নন্দিত সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ এর স্মৃতির প্রতি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি।