E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বসন্তে বাসন্তী পূজায় দেবী দুর্গার আরাধনা 

২০২৫ এপ্রিল ০৫ ১৭:৪২:১৫
বসন্তে বাসন্তী পূজায় দেবী দুর্গার আরাধনা 

মানিক লাল ঘোষ


শরৎকালে যেমন শারদীয়া দুর্গাপুজা হয় ঠিক তেমনই চৈত্র মাসে বসন্তকালে হয় বাসন্তী পূজা। মূলত দেবী বাসন্তী ভিন্ন নামে মা দুর্গারই আরাধনা। বর্তমানে শারদীয়া দুর্গাপুজার জাঁকজমক আনুষ্ঠানিকতার কাছে জৌলুস হারালেও বাসন্তী পুজাই হল আদি দুর্গাপুজা। রামচন্দ্র শরৎকালে অকালবোধন করে মা দুর্গার পুজা করার আগে দেবী দূর্গার আরাধনা হত এই বসন্তকালেই।

একই তালের ঢাকের বাদ্যি, একই রকম আবহে ষষ্ঠী থেকে দশমী পাঁচদিনের উৎসব। ভরা চৈত্র মাসেই নতুন রূপে সেজে ওঠেন মা দুর্গা। সহজ করে বলতে গেলে আদি দুর্গা। বসন্তের দেবী বলেই যাঁর নাম বাসন্তী।

চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে হয় বাসন্তী পুজা। এবছর ৩ এপ্রিল ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে - দেবী দুর্গার প্রতিমা স্থাপন করা হয়। ৪ এপ্রিল সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান ও পুজার বাকি আচার পালন। ৫ এপ্রিল অষ্টমী ও সন্ধিপুজা। ৬ এপ্রিল নবমী পূজা।শাস্ত্র মতে এইদিন বিধি পালন ও রামনবমীর আয়োজন করা হয়। ৭ এপ্রিল দশমী পূজার মধ্য দিয়ে-দেবীর বিসর্জন ও উৎসবের সমাপ্তি হবে। শারদীয় দূর্গা পূজার মতো ঐ দিম বিজয়া দশমী পালিত হবে।

পুরাণে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও গমনের জন্য চারটি বাহনের উল্লেখ রয়েছে। এই চার বাহন হল গজ বা হাতি, ঘোটক বা ঘোড়া, দোলা বা পালকি এবং নৌকা। এই প্রতিটি বাহনের রয়েছে নিজস্ব মাহাত্ম্য। এই বছর বাসন্তী পুজায় দেবী দুর্গা আগমন ও গমন গজে-হাতিতে হবে। পুরাণ অনুসারে হাতিতে চড়ে দেবীর ভ্রমণ শুভ লক্ষণ হওয়ায় এবছর মর্ত্যবাসীর সৌভাগ্য ও সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

বাঙালিদের মধ্যে দুর্গাপুজাকে ঘিরে এতো উত্তেজনা ও বর্ণিল আয়োজনের কাহিনী কমবেশি সবারই জানা। বাঙালির কাছে দুর্গা পূজার অকাল বোধন, নামেই তো পরিচয়। পুরাণ অনুযায়ী, শ্রীরামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে দেবী দুর্গার যে আরাধনা করেছিলেন, তার সময়কাল ছিল আশ্বিন মাস। অর্থাৎ আদি দুর্গাপুজার সময়কাল ধরে বিবেচনা করলে অকাল তো বটেই। তার পর থেকে যদিও সেই অকাল বোধনেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে বাঙালি। খানিকটা হলেও আড়ালে চলে যায় বাঙালির আদি দুর্গা পূজার ইতিহাস।

বছরে চারটি নবরাত্রি আসলেও তার মধ্যে দুটি নবরাত্রিকে পালন করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। যার মধ্যে একটি শরৎ নবরাত্রি অর্থাৎ দুর্গাপুজোর সময়, আর অন্যটি হল বসন্তের নবরাত্রি অর্থাৎ আদি দুর্গাপুজার সময় কালকে। বসন্ত নবরাত্রি মেনে পালন করা হয় বাসন্তী পুজাকে। শারদীয় দুর্গাপূজার মত এই বাসন্তী পুজাতেও আরাধনা করা হয় দেবী দুর্গার। যদিও সময়ের পালাবদলে যতোই জনপ্রিয় ও উৎসবমুখর হয়ে উঠছে শরতের নবরাত্রি ততই যেন জৌলস হারাচ্ছে বসন্তের নবরাত্রি তথা বাসন্তী পুজা পালনের রেওয়াজ। ভারতবর্ষে এক সময় বিশেষ করে বাংলার এই আদি দুর্গা পুজায় এ উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটিও বহাল ছিল, এখন সবটাই ইতিহাস। এই বাসন্তী পূজা ৯০ দশকের দিকে কেবল কিছু জমিদার বাড়ি তথা বনেদি বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বিংশ শতাব্দীতে এসে আবার তার ব্যপকতা বাড়তে শুরু করেছে।।

শরতের দুর্গাপুজা যেমন শ্রীরামচন্দ্রের হাতে শুরু তেমনই বসন্তের এই আদি দুর্গা পূজাকে ঘিরেও রয়েছে ইতিহাস। কথিত আছে যে, সমাধি নামক বৈশ্যের সঙ্গে মিলে চন্দ্র বংশীয় রাজা সুরথ বসন্ত কালে চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষে ঋষি মেধসের আশ্রমে প্রথমবার দুর্গা পুজ শুরু করেছিলেন। বসন্তকালে দেবী রূপের বন্দনা করা হয়েছিল বলেই নাম হয়েছিল বাসন্তী। সেই নামেই বাংলায় ছড়িয়ে পড়েন মহামায়া। এমনকী দেবী দুর্গার প্রথম পুজারী হিসাবেও চন্ডীতে রাজা সুরথের কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে।

হিন্দু পুরাণ বর্ণিত আছে রাজা সুরথ ছিলেন প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের একজন দক্ষ সুশাসক। যোদ্ধা হিসেবেও তার ছিল যথেষ্ট সুখ্যাতি। জানা যায়, তিনি নাকি কখনোই কোনও যুদ্ধে পরাজিত হননি, এতটাই পরাক্রমশালী ছিলেন রাজা সুরথ। কিন্তু সময়েরও পালাাবদল ঘটে, একসময় প্রতিবেশী রাজা যখন সুরথের রাজ্য আক্রমণ করে তখন আচমকা এই আক্রমণের জন্য কোনও ভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না রাজা সুরথ, তাছাড়া এই সময় সুযোগ বুঝে তাঁর নিজের সভাসদরাও বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে তার সাথে। ধনসম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায় যে যার মতো করে। নিজের কাছের মানুষদেট কাছ থেকে পাওয়া এরূপ অপ্রত্যাশিত ও প্রতারণামূলক আচরণে স্তম্ভিত হয়ে যান রাজা সুরথ। এরপরই তিনি রাজ্য ও সিংহাসন হারিয়ে বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মেধস আশ্রমে এসে উপস্থিত হন

একই রকম প্রতারণার শিকার হয়ে বনিক রাজ্য সমাধিও এসেছিলেন ঐ মেধস আশ্রমে। সব হারানোর পরেও তাদের মধ্যে শুভ চিন্তা ছিল সব সময়।তাদের মনোকষ্ট লাঘব করতে ঋষি মেধস তাঁদের জানান সবই মহামায়ার ইচ্ছে, আর তাঁর মুখেই প্রথম মহামায়ার বর্ণনা শোনেন তাঁরা। এরপর তপস্যা শুরু করেন রাজ্য হারা দুই রাজা। রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য পশ্চিমবঙ্গের গড় জঙ্গলে মাটি দিয়ে দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরি করে প্রথম পূজা করেন। সেটিও ছিল এই বসন্তকাল। শোনা যায়, এই পুজার পর মহামায়ার বর পেয়ে সুরথ রাজা নিজের সমস্ত হারানো সম্পত্তি ফেরত পান এবং রাজ্যে ফিরে আসেন। আর এই কাহিনী শুনেই অনুপ্রাণিত হন স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র।তাই তিনি শরৎকালেই দেবীর অকাল বোধন করেন।

প্রাচীন রাজাদের মধ্যে এমন একটা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, মহামায়ার আশীর্বাদ না পেলে যুদ্ধে জয় সম্ভব নয়। জয় সুনিশ্চিত করার জন্য ঐ সময় রাজারা ও জমিদারি রক্ষা ও হারানো জমিদারি ফিরে পেতে জমিদারগন মহামায়ার আরাধনা করতেন। সেই থেকেই রাজবাড়ী এবং বেশ কিছু জমিদার বাড়িতে বসন্তকালে বাসন্তী তথা অন্নপূর্ণা পূজা করার রেওয়াজ শুরু হয়। সময়ের পরিবর্তনে জমিদার প্রথার বিলুপ্ত হলেও নিজেদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন,দারিদ্র্যতা দূরীকরণ, মনোবাঞ্ছা পূরন,রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে এখনো জমিদারদের উত্তরসূরী ও বনেদী পরিবারে বাসন্তী পুজার আয়োজন করা হয়। তবে জগতের মঙ্গল ও অশুভ শক্তি বিনাশের লক্ষেই সাধারণ সনাতনীরা বাসন্তী পুজায় দেবী দূুর্গার আরাধনা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

লেখক : ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহ সম্পাদক।

পাঠকের মতামত:

০৬ এপ্রিল ২০২৫

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test