E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সাতক্ষীরার ধুলিহরে চা বিক্রেতা আনারুল কারিকরের মৃত্যু, থানায় মামলা

গ্রেপ্তারকৃত পাল দম্পতি জেলহাজতে, মীমাংসার জন্য ২ বিঘা জমি দাবি আসামিদের কাছে

২০২৫ এপ্রিল ০৪ ১৮:৪৯:৪৮
গ্রেপ্তারকৃত পাল দম্পতি জেলহাজতে, মীমাংসার জন্য ২ বিঘা জমি দাবি আসামিদের কাছে

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর গ্রামের সানাপাড়ায় গত বুধবার ধান খেতে পানি দেওয়াকে কেন্দ্র করে চা বিক্রেতা আনারুল কারিকরের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মৃতের ভাই মনিরুল ইসলাম মনি বাদি হয়ে বুধবার রাতে সাতক্ষীরা সদর থানায় এ মামলা দায়ের  করেন। মামলায় একই গ্রামের সুবোধ পালের ছেলে লক্ষণ চন্দ্র পাল, তার স্ত্রী ইরাবতী পাল ও ছেলে জয় পালকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত লক্ষণ চন্দ্র পাল ও ইরাবতী পালকে বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে বুধবার আনারুল ইসলামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা লক্ষণ পালের বাড়িঘর ভাংচুর করতে উদ্যত হলেও পিটিয়ে জখম করা হয় তার ভাই প্রশান্ত পালকে। লক্ষণ পাল ও তার স্ত্রী আটক হওয়ার পর পরিবারের সকলেই আত্মগোপন করার সূযোগে রাতের আঁধারে লক্ষণ পালের বাড়ি থেকে কিছু জিনিসপত্র লুটপাট ও প্রশান্ত পালের বাড়ি থেকে ৫ হাজার টাকা চুরির পাশাপাশি বিছানাপত্র তছনছ করা হয়েছে। এমনকি পোষ্টমর্টেম শেষে আনারুল ইসলাম হৃদরোগে মারা গেছে এমন খবরে একটি মহল আনারুল ইসলামের পক্ষ নিয়ে লক্ষণ পালের কাছ থেকে দুই বিঘা জমি লিখে নিয়ে মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছে।

সরেজমিনে আজ শুক্রবার দুপুরে ধুলিহর সানাপাড়ায় গেলে, মৃত আমের আলীর ছেলে মৃত আনারুল ইসলামের স্ত্রী তানজিলা বেগম জানান, ২০১৪ সালে কোহিনুর গাজীর কাছ থেকে চার শতক জমি কিনে সেখানে কোন রকমে ঘর তৈরি করে এক প্রতিবন্ধি ছেলেসহ দুই ছেলেকে নিয়ে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন তারা। একটি চায়ের দোকান করে স্বামী আনারুল জীবন জীবিকা চালাতেন। একপর্যায়ে তিন বছর ধরে ননদের স্বামী মহিদ থানদারের কাছ থেকে বালুইগাছা বিলে আট কাঠা জমি লিজ নিয়ে লক্ষণ পালের গভীর নলকুপ থেকে চুক্তিভিত্তিক পানি নিয়ে বোরো চাষ করে আসছেন। বুধবার সকালে তাদের জমিতে পানি দেওয়ার কথা থাকলেও নিজ জমিতে লক্ষণের স্ত্রী পানি দিলে বিরোধ হয় তার স্বামীর সাথে। একপর্যায়ে তার স্বামী লক্ষণ পালের খেতের আইল কেটে তাদের জমিতে পানি ঢোকালে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ সময় ইরাবতীর সাথে ধ্বস্ত¡া ধ্বস্তাধস্তির একপর্যায়ে কাস্তে দিয়ে তার হার্টের সমস্যা থাকা স্বামীকে আঘাত করে ইরাবতী। তার স্বামী খেতের মধ্যে পড়ে যেয়ে চেতনা হারালে ইরাবতী দূর থেকে চিৎকার করে তাকে অবহিত করে। আনারুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। তবে এ সময় লক্ষণ পাল ও তার ছেলে জয় পাল বাড়িতে ছিলো না। তবে লক্ষণ পালের তিনটি গরু স্থানীয় একজনের বাড়িতে রাখা হলেও বৃহষ্পতিবার তা লক্ষণ পালের ভাই প্রশান্ত পাল ও মা গীতা রানী পালের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

লক্ষণ পালের বোন নমিতা পাল জানান, মঙ্গলবার রাতে তার কাকা সন্তোষ ওরফে মানিক পালের বিক্রি করা জমিতে কালীপূজা উপলক্ষে বাপের বাড়িতে আসেন তিনি। বুধবার সকালে মায়ের প্রসাদ নিয়ে সাহাপাড়ায় রাসমিস্ত্রীর কাজে যায় দাদা লক্ষণ পাল। ভাইপো জয় শ্যালো মেশিন চালু করে পুকুর থেকে মাছ ধরে সাতক্ষীরা শহরে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাস্তে নিয়ে আনারুল দাদা লক্ষণের ধানের খেতের আইল কেটে নিজের জমিতে পানি ঢোকাচ্ছেন এমন খবর পেয়ে বৌদি ইরাবতী প্রতিবাদ করেন। তখন আনারুল বউদিকে বিভিন্ন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। একপর্যায়ে খেতের কাটা আইল বন্ধ করতে গেলে বউদিকে ধাক্কা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধ্বস্তাধ্বস্তির একপর্যায়ে আনারুল মাটিতে পড়ে যায়। পরে সঞ্জা হারানো আনারুলকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। আনারুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার ছোট ভাই প্রশান্তকে স্থানীয়রা মারপিট করে।

একপর্যায়ে সেসহ পরিবারের লোকজন প্রতিবেশি শিবপদ পালের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষণ পর সকলে কেশবপুরে চলে যান। দাদা লক্ষণ পাল ও বৌদি ইরাবতীকে পুলিশ আটক করলে বুধবার রাতে লক্ষণের ঘর থেকে কিছু জিনিসপত্র চুরি করা হয়। ভাই প্রশান্ত পালের ঘর থেকে জিনিসপত্র তছনছ করার পর পাঁচ হাজার টাকা চুরির বিষয়টি বৃহস্পতিবার বিকেলে জানতে পারেন তারা। তবে মামলা মীমাংসার নামে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি লক্ষণ পালের শ্যালক দেবহাটার টাউন শ্রীপুরের বিশ^ানথ পালের মাধ্যমে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার শর্ত দিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আনারুল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন হাসপাতাল থেকে এমন খবর পাওয়ার পর ওই মহলটি কৌশলে চাপ সৃষ্টি করে মামলা মীমাংসার নামে জমি দাবি করছেন।

প্রতিবেশী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ধান খেতের আইল কেটে লক্ষণের জমি থেকে পানি নিজের জমিতে ঢোকানোর সময় আনারুলের সাথে ইরাবতীর ধ্বস্তাধ্বস্তি হলেও জয় ও লক্ষণ তখনর বাড়িতে ছিলো না। অথচ তিনজনের নামে মামলা দিয়ে ইরাবতীর সঙ্গে লক্ষণের গ্রেপ্তার করাটা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে তিনি মনে করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালত চত্বরে ইরাবতী পাল বলেন, আনারুল ধান চাষ করে তাদের শ্যালো থেকে পানি নিলেও টাকা দিতে টালবাহানা করতো। বৃহষ্পতিবার সকালে এ নিয়ে তার স্বামী লক্ষণের সঙ্গে বিরোধ হয়েছে। বুধবার সকালে তার জমিতে আগে জল দেয়াকে কেন্দ্র করে খেতের আইল কেটে নিজের জমিতে পানি ঢোকানোর প্রতিবাদ করায় তাকে গালিগালাজ শেষে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ধ্বস্তাধস্তির একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে গেলে আনারুলের হাতে থাকা কাস্তে তার নাকে লাগে।স্বামীর ফোন বন্ধ পেয়ে আনারুল খেতে পড়ে যাওয়ার পরপরই বিষয়টি তার স্ত্রীকে অবহিত করা হয়। তার আঘাতে আনারুলের মৃত্যু হয়েছে যা সঠিক নয়। তবে স্থানীয় একটি ফেইসবুক লাইভ চক্র আনারুলকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে মর্মে যে অপপ্রচার করেছে সে কারণে পুলিশ নিজেদের সেভ করতে তাকে ও তার স্বামীকে আটক করে হত্যা মামলায় আসামী করেছে।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ অসীম কুমার সরকার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আনারুলের মৃত্যু হয়েছে এমন কথা অস্বীকার না করেই বলেন, ময়না তদন্ত প্রতিবদেন শেষে সব জানা যাবে।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার(জিআর-১৫৯/২৫ সদর) তদন্তকারি কর্মকর্তা ফারুক আলী মন্ডল বলেন, এ ঘটনায় মৃত আনারুলের ভাই মনিরুল বাদি হয়ে বুধবার রাতে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। লক্ষণ পাল ও তার স্ত্রীকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

(আরকে/এসপি/এপ্রিল ০৪, ২০২৫)

পাঠকের মতামত:

০৫ এপ্রিল ২০২৫

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test